পুলক জাগানো অভিজ্ঞতা

গত রবিবার এক দারুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। আমাদের বিভাগের সংগঠন “পোর্টফোলিও” এর উদ্দ্যোগে আয়োজন করা হয় নৌকা ভ্রমনের। নৌকাতে করে আমরা যাব পদ্মার অপর পাড়ে। দুপুর পর্যন্ত ক্লাস শেষ করে ১ম বর্ষ থেকে এমবিএ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনের একটা বিশাল দল হাঁটা দিল পদ্মার পাড়ের দিকে। সেখান থেকেই নৌকায় উঠব। ফাঁকিবাজ আমি দল ছেড়ে আস্তে সরে গিয়ে রিকসা ধরে আগেই পদ্মার পাড়ে পৌঁছে যাই। কারণ খালি পেটে অতটা হাটার শক্তি ছিল না। ২.৩০টার দিকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলতে শুরু করল। সে কি হই হুল্লুড়। মনে হচ্ছে নৌকাই ডুবে যাবে। এরপর নৌকাতেই শুরু হল খাওয়া দাওয়া। কিছুক্ষন চলল পানি নিয়ে একে অপরকে ভেজানোর খেলা। মাঝিদের সর্তক থাকার নির্দেশে কিছুটা নিস্তেজ হলাম আমরা। প্রায় ২০ মিনিট নৌকা চলার পর আমরা পৌঁছে গেলাম পদ্মা নদীর অপর প্রান্ত। নামগুলো মনে নেই। ছবিতে আছে।
নদীর পাড়ে উঠার পূর্বে পাড় দেখে টাইটানিকের বিশাল বরফের পাহাড়ের কথাই বারবার মনে হচ্ছিল।

পাড়ে উঠেই শুরু হল চিৎকার-চেঁচামেছি, ছবিতোলার পর্ব। এরপর হাঁটা দিলাম (সম্ভবত) পশ্চিমদিকে। প্রায় ৫০০ মিটার হাঁটার পর আমরা পেয়ে গেলাম একটা খোলা মাঠ। সেখানে সবাই বসে গল্প-গুজব শুরু করল। আমি আগেই ধান্দায় ছিলাম নদীতে গোসল করব। তাই ব্যাগে করে লুঙ্গি নিয়ে গেছিলাম। একটু দুরে গিয়ে লুঙ্গি পরে নেমে পড়লাম। নদীতে গোসল আসলেই বিপজ্জনক। মনে হচ্ছে আমাকে টেনে নিয়ে যাবে স্রোতের সাথে।

এরপর গোসল সেরে আরও একটু পশ্চিমে গেলাম একটা মাঠের মধ্য দিয়ে। একটা চমৎকার শিমুল গাছের ছবি তুললাম। আরও একটু সামনে যেতেই দেখি বিডিআর। কথা বলার পর জানা গেল আমি যেখানে দিয়ে হেঁটে এলাম ওটা ভারতের জমি। অথ্যাৎ শিমুল গাছটাও ছিল ভারতের। আমি বিশাল মাঠসহ বাড়িগুলোর ছবি তুলেছি। ওটাও ভারতের। বিডিআর তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলল। আমরা নিরাপদ এলাকায় মাঠে বসে নিজেদের আলাপ চারিতা শেষে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এরই মধ্যে নৌকা মাঝি বলল, আমরা যদি কোর্টের এলাকার ঘাটে নামি তাহলে তাদের সুবিধা হয়। কারণ তাদের বাড়ি সেখান থেকেও ঐদিকেই আরও দুরে। যেহেতু নৌকাটি সৌজন্যতার খাতিরে পাওয়া তাই তাদের অনুরোধ রাখতে হলো। নৌকা চড়ে বসলাম। শুরু হল গানের পর্ব।কখন যে কিভাবে আমরা দুটো ভাগ হয়ে গেলাম বুঝি নি। এরপর চলল এই দুপক্ষের মধ্যে গানের লড়াই। আর কিছুক্ষণ পরপরই এ পক্ষ ও পক্ষকে “ভুয়া ভুয়া” বলে সম্মোধন। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট নৌকা চলার পর মাঝিদের মধ্যে (ওরা ৩জন ছিল সম্ভবত) কেমন যেন একটা চাপা-চাপা ভাব দেখা গেল। প্রথম শুনলাম তেল শেষ। পরে বলল যে তেল আছে তাতে যাওয়া যাবে কিন্তু ইঞ্জিনে সমস্যা হচ্ছে। এর অনেক আগেই কিন্তু সূর্য ডুবে গেছে। সবাই খুব টেনশনে। আমরা টেনশনে পড়লাম মেয়েদেরকে নিয়ে। কিন্তু উপায় নেই। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। একটা চর পর্যন্ত তারা নৌকা নিয়ে এল বৈঠা দিয়ে। সেখানে সবাই নামলাম।

মাঝি জানালো এখান দিয়ে উঠা যাবে কিন্তু পুরোটাই জঙ্গল। রাতের বেলায় মেয়েদের নিয়ে ওখান দিয়ে যাওয়া নিরাপদ হবে না। তাই আমাদেরকে ঘুরে যেতে হবে। ঘন্টা খানেক হাঁটলেই নাকি রাস্তা পাওয়া যাবে। উপায় না পেয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। মাঝিকে অনুসরণ করতে লাগলাম। বালির উপর হাঁটা এক ভয়াবহ কঠিন ব্যাপার। পা রাখলেই পা দেবে যাচ্চে। প্রায় আধা ঘন্টা হাটার পর চর থেকে পাড়ে উঠলাম। আসলে এটাও চর। তবে বেশ উচু। সেখানে এল এক নতুন সমস্যা। বালির উপর এক ধরণের গাছ আছে কাঁটার মত। পায়ে লাগলেই পা কেটে যাচ্ছে। অনেকের পা ই কেটেছে। কিন্তু উপায় নেই। ওভাবেই ঘন্টা দেড়েকের মত হাঁটতে হল। আমরা সবাই লাইন ধরে হাঁটছিলাম। আমি ছিলাম একটু সামনের দিকে। পেছনে তাকাতেই দেখি জোনাকি পোকার মত মোবাইলের আলো জ্বলছিল। অদ্ভুত লাগছিল দেখতে। যদিও বিডিআর এর ঝামেলা এড়াতে মোবাইল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল কিন্তু কেউ তা করতে পারেনি। কারণ মোবাইল বন্ধ করলেই পাঁ কাটবে।

যতই হাঁটছি ততই মনে পড়ছিল স্টার মুভিস এ দেখা বিভিন্ন সিনেমার কথা। মনে হচ্ছিল পেছন থেকে একজন একজন করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে আমরা একটা গ্রামের সন্ধান পেলাম। গ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আর সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। কেউ কেউ দোকান থেকে হালকা খাবার দাবার ও পানি নিচ্ছিল। এভাবে প্রায় ৩০মিনিট হাঁটতে হলো। সবশেষে এসে উঠলাম রাজশাহী-চাপাই বাইপাস রোডে। সবার চিৎকার আর দেখে কে। ‘জয়যাত্রা”র শেষে যখন দেশ স্বাধীনতার পতাকা দেখে সবার যেরকম আনন্দ হয়েছিল আমাদেরও অনেকটা সেরকম মনে হয়েছিল। সাথে সাথেই একটা বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠে চড়লাম। সকলের চেহারা তখন নতুন প্রাণ। সবাই তখন গাজী’র মত যুদ্ধের গল্পে ব্যস্ত। গাড়ি আমাদেরকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রাজি হল। আমার বাসা ক্যাম্পাসের আগে হওয়াতে আমি নেমে গেলাম আগেই। সবাই চলে গেল ক্যাম্পাসে। সেখান থেকেই মেয়েদেরকে যার যার হলে পৌঁছে দেব।

আসলে এতক্ষণ যা লিখলাম তা একটা রেকর্ড মাত্র। বাস্তব অনুভূতি এখানে বোঝানো (অন্তত: আমার পক্ষে) সম্ভব নয়। কারণ হাঁটার রাস্তা হিসেব করলে মোটামুটি ২.৫-৩ কিলোমিটার হবে। কিন্তু বালি’র উপরে হাঁটা যে কি কষ্টকর সেটা অভিজ্ঞ ছাড়ানো বোঝানো সম্ভব নয়। তাও আবার চোরাবালির আতঙ্ক তো রয়েছেই।

সর্বোপরি, এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা যে অবশেষে সবাইকে নিয়ে আমরা ঠিকমত পৌঁছাতে পেরেছি।

কিছু ছবি আছে ফ্লিকারে। সবাইকে দেখার অনুরোধ রইল। এখানে অবশ্য সবগুলো ছবি দেয়া হয়নি। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক ছবিগুলো দিয়েছি। কারণ ইন্টারনেটে এভাবে মেয়েদের ছবি দেয়া হয়তো ঠিক নাও হতে পারে।

প্রথম প্রকাশ: প্রজন্ম ফোরাম

  • well, hmmm… I suppose it should be interesting, though i do not understand anything nor can i even define where one sentence ends and another begins!))) is there any translaion?))