বাংলাদেশের সীমানা ছুঁয়ে…

এর আগে একবার তিস্তা ব্যারেজ দেখে অদ্ভূত ভাল লেগেছিল! তখন থেকেই পরিকল্পনা ছিল সুযোগ পেলেই আবার আসব দেখতে! অফিসের কাজ, ইন্টার্ণশীপ এবং তার রিপোর্ট লেখা, ঈদের পর এমবিএ ফাইনাল সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম! তখনই তুষারের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম বৃহ:স্পতিবার আবার নীলফামারি যাব এবং যেহেতু এ সময় বিশাল বড় একটা চাঁদ পাওয়া যাবে, রাতে বেলায় তিস্তা ব্যারেজ দেখতে নিশ্চয়ই মজা হবে! তুষার রাজি হল! আমি অলজবসবিডি.কম এর এডমিন খোকন ভাইকে ফোন দিলাম তিনি কুড়িগ্রাম থেকে এসে আমাদের সাথে যোগ দিতে আগ্রহী কিনা! তিনি রাজি হলেন! আমি বৃহঃষ্পতিবার সকালে তিতুমির এক্সপ্রেসে রাজশাহী থেকে ট্রেনে উঠলাম নীলফামারির উদ্দেশ্যে! ১১টার দিকে খোকন ভাই মোটর সাইকেল নিয়ে কুড়িগ্রাম থেকে রওনা দিলেন নীলফামারির উদ্দেশ্যে! হঠাৎ মনে হল আমার তো পর্যাপ্ত টাকাই নেয়া হয়নি! তাই আমি সৈয়দপুর নেমে গেলাম! সেখানে ডিবিবিএল এর বুথ থেকে টাকা তুলে খোকন ভাইকে ফোন দিলাম! তিনি বললেন ৩০ মিনিটের মধ্যে তিনি সৈয়দপুর পৌঁছে যাবেন! আমি ভাবলাম তাহলে এখান থেকে একসাথেই যাব! আমি একটা রিকসা নিয়ে ঘুরলাম! প্রথমেই রেল কারখানায় গেলাম! গেটের গার্ড বলল (ঐ) লাল রুম থেকে আগে পারমিশন আনতে হবে! আমি সেখানে গিয়ে বললাম আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছি, আমি ভেতরে দেখতে চাই! তিনি বললেন আজকে তো অফিস ছুটি! শনিবার আসেন! আমি বললাম অনুমতির নাকি ব্যাপার আছে?

তিনি বললেন আপনি আসেন, ব্যবস্থা হবে! গেটে আরেকজন বললেন আসেন, আমি ঘুরিয়ে দেখাব!
তারপর সৈয়দপুরে আরো কিছুক্ষণ ঘুরলাম এবং একটা শপিং মলে গেলাম! তারপর বাস স্ট্যান্ডের কাছে মিনিট দুয়েক দাঁড়াতেই খোকন ভাই তার এক কাজিন সহ মোটর সাইকেল নিয়ে হাজির! এরপর ৩জনে মোটর সাইকেলে করে নীলফামারি (প্রায় ২০ কি.মি) তুষারের অফিস সংলগ্ন বাসায় পৌঁছে গেলাম! রেস্ট নিয়ে দুপুরে খেলাম  b-( তারপর একটা ছোট্ট ঘুম দিয়ে আরো একটি মোটর সাইকেল নিয়ে আমরা ৪জন যাত্রা করলাম তিস্তা ব্যারেজের উদ্দেশ্য! ক্যানাল থেকে আমি ড্রাইভিং শুরু করলাম! সন্ধ্যার সময় ৬০+ গতি নিয়ে চালানোর অভিজ্ঞতা এই প্রথম! আগেই ঠিক করা পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউজে ব্যাগ রেখে আমরা চলে গেলাম ব্যারেজে! সেখানে ঘন্টা দুয়েক কাটালাম! চাঁদের আলোচ অসাধারণ লাগল সময়টা! পানির শব্দ, চাঁদের আলো সব মিলিয়ে অপার্থিব লাগল! সেখান থেকে আমরা রেস্ট হাউজে এসে (ব্যারেজ থেকে ৪ কি.মি এর মত দুরুত্ব) খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুম দিলাম রাত ১টার দিকে!

সকালে উঠে সিন্ধান্ত নেয়া হলো আর একবার ব্যারেজ দেখে আমরা নিলফামারি ফিরে যাব! আমরা ব্যারেজে এবং তার আশে পাশে অনেকক্ষণ ঘুরলাম! নৌকায় করে চরে গিয়ে ছবি তুললাম! তারপর ফিরে আসব এমন সময় সবার মনে হল ভ্রমণটা এখনও স্বার্থক হয়নি! কারণ সবাই আমরা আগে একবার ব্যারেজে গেলাম! তখন সিন্ধান্ত হল আমরা আঙ্গুরপোতা-দহগ্রাম যাব তিন বিঘা করিডোর দিয়ে! ব্যাস, আবার যাত্রা শুরু হল! কত কিলো গেলাম সেটা খোকন ভাই ভাল বলতে পারবে

২-৩ টা রেস্ট দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম করিডোরের গেটে! ডিউটিরত বিডিআর এর সাথে কথা বলে ব্যাপারটি জানলাম! তারা বলল কোন ভয় নেই! আপনার ডানে বামে না গিয়ে সোজা চলে যান! ঐ পাশেও আমাদের লোক ডিউটিরত আছে! তারপরও একটু ভয়ে ভয়ে (বিশাল দেহি এক শিখ কটমট করে তাকিয়ে ছিল) মোটর সাইকেল নিয়ে পারলাম হলাম! ভয় পাওয়ার কারণও আছে! বিএসএফ তো পাখি মারার মত করে বাংলাদেশিদের মারে! সে খবর তো আর আমাদের অজানা নয়!

ওপাশে নেমে বিডিআরের অন্য লোকদের সাথে কথা বলে পুরো বিষয়টা জানলাম! তাদের অনুমতি নিয়ে সেখানে ছবিও তুললাম! আমি ফোরামে একটা পোস্টও দিলাম। বিডিআর কে জিজ্ঞেস করলাম হেঁটে পার হওয়া যাবে কিনা! তারা বলল কোন সমস্যা নেই! তাদের সাথে অনেক্ষণ কথা বলে (এই দুইজন জোয়ান খুবই আন্তরিক ছিলেন) হেঁটে পার হলাম! তারপর এ পাশের বিডিআরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম! যাওয়ার সময় আমি অর্ধেক চালালেও এবার প্রায় পুরোটা পথই আমিই ড্রাইভিং করলাম! অন্যটা করছিলেন খোকন ভাইয়ের কাজিন! তিস্তা ব্যারেজের থেকে প্রায় ১০ কি.মি আগে একটা রাস্তা লালমনিরহাট চলে গেছে! খোকন ভাই ও তার কাজিন সে রাস্তা দিয়ে আবার কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা হলেন আর আমরা আবার ব্যারেজ এর উপর দিয়ে নিলফামারির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম! অনেক সাহস  :-S নিয়ে সেতুর উপর ৮৫ কি.মি এর মত গতি তুললাম! তারপর আমার স্টিডি ৫০-৬০ এর মধ্যে রেখে ফেরত আসলাম!

কিন্তু সমস্যা হল ক্যানাল এর রাস্তা শেষই হচ্ছে না! মনে হচ্ছিল এত বড় রাস্তা তো আগে পার হইনি! হঠাৎ এক জায়গা দেখলাম গোসল করার সুন্দর ব্যবস্থা! যদিও আমাদের নদীতে গোসল করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পানি বালু থাকায় করিনি! অথচ এখানের এত স্বচ্ছ পানি দেখে আমি আর তুষার নেমে পড়লাম! গোসল সেরে আবারও ভোঁ! কিন্তু একি! ক্যানালের পাশে দিয়ে যাওয়া পাকা রাস্তা তো এখানেই শেষ! তার মানে নিশ্চিত হলাম আমরা একটা ডানে’র টার্ন মিস করেছি! লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে ফেরত এলাম! অনেকটা রাস্তা আসার পর আমাদের রাস্তা খুঁজে পেলাম! অথ্যাৎ আমরা প্রায় ২৫ কি.মি রাস্তা বেশি ঘুরেছি!  ;(

অবশেষে নিরাপদে বাসায় পৌঁছেছি! এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে লম্বা রাস্তা মোটর সাইকেল ড্রাইভিং! ১০০-১৩০ কি.মি. হবে মনে হয়! কারণ শুধুমাত্র আসার পথেই আমি প্রায় ৬২ কি.মি ড্রাইভিং করেছি! এত টায়ার্ড লাগছিল যে রাতে আর কিছু লেখার শক্তি পাইনি! ঘুম থেকে উঠে লেখা শুরু করলাম! প্রায় ১ ঘন্টা লাগলো এটি শেষ করতে!

দুঃখজনক ব্যাপার হল আজকে রেল কারখানা দেখতে যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে পারছি না একা বলে! কারণ খোকন ভাই চলে গেছেন! তুষারের অফিস! একা একে গিয়ে তো আর ভাল লাগবে না!  🙁

আরও ছবি